দীর্ঘ অনুসন্ধানে মনোযোগ ধরে রাখার ৬টি উপায়

Print More

English

২০১৭ সালের শেষদিককার ঘটনা। টাম্পা বে টাইমসে আমার রিপোর্টিং সহযোগী ছিলেন ক্যাথলিন ম্যাকগ্রোরি। ফ্লোরিডার সেন্ট পিটার্সবার্গের জন হপকিন্স অল চিলড্রেনস হাসপাতালের হার্ট সার্জারি বিভাগের সমস্যা নিয়ে তিনি কিছু তথ্য পান।

সেই সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তৈরি হয় “হার্টব্রোকেন” নামের অনুসন্ধানী ধারাবাহিক। আমরা যতগুলো প্রকল্পে এখন পর্যন্ত কাজ করেছি, তার মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে জটিল। আমাদের কাছে চিকিৎসা সেবার অনিয়ম নিয়ে মামলার কোনো নথি ছিল না। হাসপাতাল থেকে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হচ্ছিল না। তাদের হার্ট ইউনিট কতটা ভালোভাবে চলছে, সেই উপাত্ত বের করার পদ্ধতিও জানা ছিল না।

এক এক সময় মনে হচ্ছিল আর সম্ভব না। আমরা প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম।

এভাবেই আমরা টানা কয়েক মাস কাজ করি। একপর্যায়ে দেখতে পেলাম, ২০১৭ সালে আমেরিকার হাসপাতালে গড়ে যত শিশু মারা গেছে, এই হাসপাতালে মৃত্যুর সংখ্যা তার তিনগুণ বেশি।

হাসপাতালের হার্ট ইনস্টিটিউটের জরুরী চিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা ২০১৫ সালেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিন্তু সেসময় কেউ পাত্তা দেয়নি।

আমরা, প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার পর বেশ হইচই শুরু হয়। প্রতিবেদনটি কীভাবে করেছি তা নিয়ে ইউএসসি অ্যানেনবার্গ সেন্টার ফর হেলথ জার্নালিজমে এরইমধ্যে লিখেছেন কেট। হার্ট ইনস্টিটিটিউটের রোগীদের দেখা পাওয়া, রোগী ভর্তির তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ আর ভেতরে যোগাযোগ কীভাবে ঘটল – সেই সব বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন লেখাটিতে।

রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি আমরা আর কী কী করব তার একটি নির্দেশিকাও তৈরি করেছিলাম, যাতে মাঝপথে হাল ছাড়তে না হয়। আমরা সবসময় সেই নির্দেশিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারিনি। কিন্তু এগুলো মাথায় থাকার কারণেই দীর্ঘ সময় নিয়ে এই অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়েছিল।

একটি জটিল, দীর্ঘমেয়াদী রিপোর্টিং প্রকল্প কীভাবে শেষ করা যায়, তা নিয়ে আমাদের কিছু পরামর্শ, এখানে তুলে ধরছি।

১. সম্পাদকের সাথে নিবিড় যোগাযোগ

প্রতিদিনই আমরা কোনো না কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতাম। হয়তো দেখা গেল, একজন সোর্স বা তথ্যদাতা ফোন ধরছেন না। আমরা যে ডেটা বিশ্লেষণ করেছি, কোনো গবেষণাপত্র হয়তো তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল। এমন সব ঝামেলায় পড়তে হত হরহামেশা। দেখা যেত, একেকটা দিন কোনো কাজই এগুচ্ছে না।

কেট আর আমি প্রতিদিন, সম্পাদক অ্যাডাম প্লেফোর্ডকে কল দিতাম কিংবা বার্তা পাঠাতাম। প্রতিদিনকার ঝামেলা থেকে তিনিই আমাদের বের করে আনতেন; সমস্যা বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপও ঠিক করে দিতেন। এটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাকে ছাড়া আমরা হয়তো একের পর এক সমস্যার চোরাবালিতে আটকে যেতাম। মাসের পর মাস আমাদের এভাবেই পার হতো।

কেট আর আমি সমস্যা সমাধান করতে পারি না, এমনটা নয়। কিন্তু এই ধরনের কাজে, বাইরের কারো নজর থাকলে তা বেশ কাজে দেয়। সাধারণত আমরা একই সময়ে একাধিক কাজের মধ্যে থাকতাম। একটিতে পিছিয়ে গেলে, পুরো কাজের গতিই থমকে যেত। কিন্তু অ্যাডাম আমাদের সঠিক পথে রাখতেন। এতে কাজের গতিও বজায় থাকত।

কোনো একজনের সাথে নিয়মিত আলাপ করার বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। সম্পাদককে না পেলে, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব, মেনটর বা আপনার পরামর্শদাতাদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিন।

টাম্পা বে টাইমসের ধারাবাহিক প্রতিবেদন হার্টব্রোকেন থেকে নেয়া স্ক্রিনশট।

২. সাপ্তাহিক কাজের তালিকা তৈরি

হার্টব্রোকেন এর জন্য শুরুতেই আমরা একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করি। কিন্তু তার একেকটি ধাপ শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগছিল। এটা যে কেমন হতাশার, তা বলে বোঝানো যাবে না। সামনে এগুনোই অসম্ভব মনে হচ্ছিল।

আমরা দ্রুত বুঝতে পারলাম এমন ভাবে এগুতে হবে যাতে নির্দিষ্ট কিছু কাজে মনোযোগ দেয়া যায়। অ্যাডাম প্রতি সপ্তাহের একটি লক্ষ্য ঠিক করে দিতেন। সে অনুযায়ী আমরা প্রতি মঙ্গলবার আপডেটগুলো নিয়ে বসতাম এবং আলোচনা করতাম। এই তালিকায় চারটি বিষয় থাকত: গত সপ্তাহের পর্যালোচনা, এই সপ্তাহের অগ্রাধিকার, যে কাজে আমরা বেশি জোর দিব এবং প্রধান লক্ষ্য।

কয়েক সপ্তাহ ভালোই কেটেছে। যেমন, এক সপ্তাহে আমরা বেশ কয়েকজন রোগীর অভিভাবকের সাথে দেখা করেছি,  কিছু অপ্রকাশিত নথি পেয়েছি। বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপের পাশাপাশি ডেটা বিশ্লেষণেও বড় ধরনের অগ্রগতি এসেছে। অন্য দিকগুলো ধীরগতিতে এগুলেও আমরা রিপোর্টিংয়ের কাজ এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি।

কাজের একটি তালিকা থাকা ভালো। ভাববেন না, এর মাধ্যমে সম্পাদক আপনার ওপর নজর রাখছেন। বরং প্রতিবেদক হিসেবে আমাদের অগ্রগতি কতটা, সেটি এই তালিকা থেকে বোঝা যায়। এর ফলে, বছর শেষে এমন একটি ডকুমেন্ট দাড়ালো যেখানে আমাদের প্রায় প্রতি সপ্তাহের কাজের রূপরেখা ছিল। রিপোর্ট লেখার সময়ও এই তালিকাতে আমরা বারবার ফিরে গেছি। খুঁজে দেখেছি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাদ গেল কিনা।

৩. কোনো উদ্বেগ থাকলে জানান

এই রিপোর্ট করার পুরো সময় জুড়ে কোনো না কোনো বিষয় আমাদের চিন্তায় ফেলেছে। তথ্য উপাত্তগুলো কতটা নির্ভুল, তথ্যদাতারা কি সঠিক বলেছেন, কিংবা আমাদের স্টোরিতে যথেষ্ট ন্যায্যতা আছে কিনা, ইত্যাদি।

কোনো কিছু নিয়ে সমস্যায় পড়লে তা দলের অন্যদের সাথে যত দ্রুত সম্ভব আলাপ করেছি। সেগুলো ফেলে রাখলে বরং জটিলতা বাড়ে। কিন্তু আগেভাগে আলাপ করে নিলে প্রতিবেদনটি শক্তিশালী হয়।

শুরুর দিকের একটি ঘটনার কথা বলতে পারি। সার্জারির পর বুকে সুঁই রেখেই হাসপাতাল থেকে এক নবজাতক শিশুকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। একজন বিশেষজ্ঞ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, কোনো কোনো সময় এটি স্বাভাবিক। সার্জন যদি সুঁই খুঁজে বের করা ক্ষতিকর মনে করেন তাহলে এমনটা ঘটতেই পারে।

সে সময় আমার নজর এক দিকেই নিবিষ্ট ছিল। তাই বিশেষজ্ঞের কথা শুনে মনে হলো, এই ঘটনার হয়তো তেমন কোনো সংবাদ মূল্য নেই। আমি আসলে ভুল বুঝেছিলাম। এটা নিয়ে দলের অন্য সদস্যদের সাথে ফোনে আলাপ করলাম। তারা মনে করিয়ে দিল, সুঁই রেখে দেয়ার ব্যাপারে শিশুটির অভিভাবক কিছুই জানতেন না, যা আইনের গুরুতর লংঘন। হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী সুঁই সংক্রান্ত দ্বিতীয় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যার কারণে হার্ট প্রোগ্রাম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রতিবেদনে আমরা বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে বলেছি, এই ধরনের ঘটনা চিকিৎসায় ঘটতে পারে। কিন্তু সেই সাথে এটিও উল্লেখ করেছি যে, সেগুলো যথাযথভাবে রোগী বা তার পরিবারকে জানাতে হবে।

এ ধরনের নিয়ম ভাঙার ঘটনা যে হরহামেশাই ঘটে, পরবর্তীতে তা-ও রিপোর্টে উঠে এসেছে। সুঁই থেকে যাওয়ার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকেও কিছু জানানো হতো না। যা আইনের আরেকটি অবমাননা। নভেম্বরে এই অনুসন্ধান প্রকাশিত হওয়ার পর জন হপকিন্সের অভ্যন্তরীন তদন্তে হার্ট ইনস্টিটিউটের এমন আরো ১৩ টি ঘটনা পাওয়া গেছে যেগুলো সরকারকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি।

৪. পাঠকের প্রতি অকপট ও স্বচ্ছ থাকুন

হার্টব্রোকেন নিয়ে কাজের শুরুর দিকে প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল ডেটা বিশ্লেষণ।

আমাদের রিপোর্টে ড. জেফরি জ্যাকবস নামের একজন সার্জনের কথা লেখা হয়েছে। তিনি শিশুদের হার্ট সার্জারির ডেটা নিয়ে কাজ করেন। অন্য সংবাদ মাধ্যমগুলোও এই ধরনের প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে। বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের সহলেখক তিনি। সেগুলো ওপেন ডেটা নির্ভর, সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণধর্মী। হার্ট সার্জারি প্রকল্পের চিকিৎসার মান কেমন সেটি জানতে তিনি আমাদের ঐ হাসপাতালের ভেতরকার ডেটা ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

টাম্পা বে টাইমসের হার্টব্রোকেন থেকে নেয়া স্ক্রিনশট।

তবে হাসপাতাল তাদের নিজস্ব ডেটা দিতে রাজি হলো না। আমরা তখন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত যেসব ডেটা হাতের কাছে রয়েছে, সেগুলো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই। তবে একটি বিষয়ে আমরা সঙ্কল্পবদ্ধ ছিলাম। আমাদের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া হবে বিস্তৃত এবং বস্তুনিষ্ঠ।  এ বিষয়ে যত ধরনের গবেষণা হয়েছে, তার সবই আমরা খুঁজে বের করেছি। আলাপ করেছি প্রথম সারির বিশেষজ্ঞদের সাথেও। তাদের যুক্তিগুলো আমরা লেখাতে সরাসরি তুলে এনেছি।

সবশেষে, আমরা যাই পেয়েছি, ডেটা বিশ্লেষণ প্রণালীতে লিখে রেখেছি। পাইথন কোড এবং বিশ্লেষণের ফলাফলও গিটহাবে প্রকাশ করা হয়েছে। (অঙ্গরাজ্য সরকারের সাথে চুক্তির কারণে প্রাথমিক ডেটা প্রকাশ করা যায়নি।)

প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর আমরা যেসব ডাক্তার এবং ডেটা বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলেছি তাদের বেশিরভাগই কাজের প্রশংসা করেছেন। কয়েকজন গবেষণা পদ্ধতির নির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

৫. বারবার লেখার অভ্যাস করুন

আমরা প্রতিবেদনটি অনেক বার লিখেছি। নভেম্বরে ছাপা হওয়া অনুসন্ধানটি, আলাদাভাবে ২০ বার লেখা রয়েছে। এমনকি ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে অন্তত ২০টি পদ্ধতিতে।

আমাদের লেখার প্রক্রিয়াটি অনেকটা সফটওয়্যার বানানোর মত। প্রথম ৫টি খসড়াতেও গল্প পুরোপুরি শেষ করার চেষ্টা আমরা করিনি। দ্রুত খসড়া লেখা শেষ করে, বরং সেখান  থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি, কোথায় সমস্যা আছে।

প্রতিবেদনটি লিখে ফেলার পর, সেখান থেকে ত্রুটিগুলো বেরিয়ে আসে, পাশাপাশি নতুন নতুন ধারণাও পাওয়া যায়। এরপর আগের খসড়াটি পরিবর্তন করে নতুন আরেকটি লিখতে হয়। এভাবে চালিয়ে যান যতক্ষণ প্রতিবেদনটি পুরোপুরি প্রস্তুত না হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াতে খসড়াগুলো হয়তো একের পর এক বদলে যেতে থাকবে। পুরো একটি অংশ বাদও যেতে পারে। আর একারণে সবশেষ স্টোরিটি সবদিক থেকেই ভালো হয়।

৬. আস্থা রাখুন প্রক্রিয়াতে

টাম্পা বে টাইমসে যোগ দেয়ার পরই যেসব পরামর্শ পেয়েছি, এটি ছিল তার একটি। এরপর থেকে আর কথাটি ভুলিনি। প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা আর তাদের কাজের প্রক্রিয়ায় আস্থা রেখেছি।

দীর্ঘকালীন রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে একজন প্রতিবেদককে অনেকবারই সংশয়ে পড়তে হয়; কখনো দিনটাই খারাপ বলে, কখনো সহকর্মীর সাথে রেষারেষির কারণে, আবার অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই। মনে হবে, প্রতিবেদনটি ঠিক পথে এগুচ্ছে না; এখনো বিস্তর কাজ পড়ে আছে, শেষ কবে হবে বোঝা যাচ্ছেনা; অথবা স্টোরিটিই হয়তো আর ভালো লাগছে না।

এই ধরনের সংশয় আপনাকে পুরোপুরি ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রিপোর্টিং আর সম্পাদনার উপরই আস্থা রাখতে হবে। রিপোর্টিং চালিয়ে যান, খসড়া লিখতে থাকুন, গল্পটি আরো ভালোভাবে প্রকাশ করুন। এই পদ্ধতিটি আগেও কাজে লেগেছে এবং আগামীতেও লাগবে।


লেখাটি এর আগে সোর্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

 নিল বেদি টাম্পা বে টাইমসের অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তার আগে ডেটা রিপোর্টার এবং ডেভেলপার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালে টাইমসে যোগ দেয়ার আগে জেপি মর্গান চেজের কর্পোরেট এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে প্রযুক্তি বিশ্লেষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *