ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন ট্র্যাকিং করবেন যেভাবে

Print More

English

ছবি: পিক্সাবে

রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার বিটকয়েন (বিটিসি) লেনদেন নিয়ে বেলিংক্যাটে একটি টিউটোরিয়াল পোস্টের পর থেকে, অনেকেই এই বিষয়ে আরো জানতে চেয়ে অনুরোধ করেছেন। তাদের সন্তুষ্ট করার জন্যেই আরেকটি টিউটোরিয়াল তৈরি করেছি। এখানে ইজ আদ-দ্বীন আল-কাসেম ব্রিগেডের বিটকয়েন তহবিল সংগ্রহের একটি কেস স্টাডি ব্যবহার করা হয়েছে।

যা প্রয়োজন

কোনো বিটকয়েন ঠিকানা কার্যকর উপায়ে বিশ্লেষণের জন্য আমি চারটি টুলের উপর নির্ভর করি।

  • বিটকয়েন ব্লকএক্সপ্লোরার-এর মাধ্যমে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে ঢোকা যাবে। সবার জন্য উন্মুক্ত এই তথ্যভান্ডারে একটি নির্দিষ্ট ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতিটি লেনদেনের হিসাব পাওয়া যাবে।
  • বিটকয়েন হুজ হু নামের টুলটি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট বিটকয়েন ঠিকানা খোঁজা যাবে এবং কোনো অপরাধের সাথে তার সংযোগ আছে কিনা তাও জানা যাবে। তবে মনে রাখবেন অনিয়ম বা অবৈধ কার্যকলাপের তালিকাটি তৈরি হয়েছে, এই টুল ব্যবহারকারীদের দেয়া তথ্য থেকে। এখানে নাম না থাকলে যে সেটি অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত না, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
  • ওয়ালেট এক্সপ্লোরার অনেকটা বিটকয়েন এক্সপ্লোরারের মতই। এখানেও লেনদেনের  বিবরণ পাওয়া যায়। এটি বাড়তি তথ্য হিসেবে একই বিটকয়েন ওয়ালেটে থাকা অন্য ঠিকানাগুলোরও খোঁজ দিবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি ঠিকানা কোন এক্সচেঞ্জের সাথে যুক্ত তাও দেখায় টুলটি।
  • গুগল সার্চ করেও কোনো নির্দিষ্ট বিটকয়েন ঠিকানার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্লগ পোস্ট, প্রতিবেদন কিংবা ওয়েবসাইটের সন্ধান পেতে পারেন।

এই টুলগুলোর কোনোটিতেই ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন বিশ্লেষণের সব সুবিধা একসাথে পাওয়া যায় না। তবে সম্মিলিতভাবে এগুলো বেশ কার্যকর হতে পারে।

ইজ আদ-দ্বীন আল-কাসেম ব্রিগেডস

চাঁদা বা অনুদান চেয়ে আল কাসেম ব্রিগেডের আবেদন

ফিলিস্তিনের ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী হামাসের সামরিক শাখা ইজ আদ-দ্বীন আল-কাসেম ব্রিগেড। তারা আল কাসেম ব্রিগেড নামেই বেশি পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের তালিকায় সন্ত্রাসী হিসেবে নাম আছে শুধু আল কাসেম ব্রিগেডের।

২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি আল কাসেমের টেলিগ্রাম চ্যানেলে পোস্ট করা একটি বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনশট টুইট করে অরোরা ইন্টেলিজেন্স। তাতে Nj3y দিয়ে শেষ হওয়া একটি বিটকয়েন ঠিকানায় অনুদান পাঠানোর আবেদন জানানো হয়। দুইদিন পর টেলিগ্রামে পোস্ট করা আল কাসেমের আরেকটি বিজ্ঞাপন শেয়ার দেয় অরোরা। সেখানে ভিন্ন একটি বিটকয়েন ঠিকানা ছিল যা শেষ হয়েছে P6MD দিয়ে।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই দু্ই ঠিকানায় প্রায় ৫,০০০ ডলার সমমূল্যের বিটকয়েন জমা পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য এটিই সবচেয়ে সফল বিটকয়েন তহবিল সংগ্রহ অভিযান। ৫,০০০ ডলার শুনে অল্প মনে হতে পারে। কিন্তু আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ইয়াইয়া ফানুসি মনে করেন, এই গতিতে অনুদান সংগ্রহ করতে পারলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর জন্য তহবিল যোগানোর নির্ভরযোগ্য একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বিটকয়েন।

আপনার যা করণীয়

সংক্ষেপে বিষয়টি বোঝানোর জন্য আমরা শুধু Nj3y ঠিকানার নির্দিষ্ট কয়েকটি লেনদেনে মনোযোগ দিব। যদিও এই ঠিকানাগুলো থেকে চাইলে আরো অনেক কিছুই বের করা সম্ভব।

কোনো ঠিকানা বিশ্লেষণের আগে কম্পিউটারের পর্দাকে দুই ভাগ (স্পি্লট) করে একপাশে ব্লকএক্সপ্লোরার আর অন্যপাশে বিটকয়েন হুজ হু খুলে রাখুন। আলাদা ট্যাবে ওয়ালেট এক্সপ্লোরার এবং গুগল খোলা থাকবে।

এর পাশাপাশি অবশ্যই এক্সেল স্প্রেডশিট বা গুগল শিট এর ট্যাব খোলা রাখবেন। যাতে লেনদেনের তথ্য টুকে রাখতে পারেন। এক্সেল শিটে তহবিলের প্রাপক ও প্রেরকের ঠিকানা, তারিখ ও সময় এবং বিটকয়েনের পরিমান লিখে রাখতে পারেন।

 

শুরুতেই ব্লকএক্সপ্লোরারে Nj3y লিখে সার্চ দিন। ফলাফলে, ঐ ঠিকানায় হওয়া লেনদেনের বিবরণ পাবেন। সেটি মনোযোগ দিয়ে দেখুন। আমি সাধারণত প্রথম লেনদেনটি দিয়ে শুরু করি। ক্রমান্বয়ে সবশেষটিতে যাই। তবে এটি আপনার ইচ্ছা। পরবর্তী ধাপে খুঁজতে হবে লেনদেন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য।

  • বিটকয়েন হুজ হু, ওয়ালেট এক্সপ্লোরার এবং গুগলে ঠিকানা লিখে সার্চ দিন।
  • প্রতিটি ট্যাবেই খুঁজে দেখুন সন্দেহজনক কিছু দেখাচ্ছে কিনা
  • পাওয়া গেলে সেটি স্প্রেডশিটে রাখুন, না হলে পরবর্তী লেনদেন দেখুন।

সহজ না? চলুন কিছু উদাহরণ দেখে নিই।

৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখে bu1s দিয়ে শেষ হওয়া একটি বিটকয়েন ঠিকানা থেকে Nj3y-তে ০.০৩১৩০৫৭৯ বিটিসি পাঠানো হয়। আরো চারবার এই ঠিকানাটি টাকা পাঠায় হামাসের দেয়া বিট কয়েন ঠিকানা Nj3y-তে। যার মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন ছিল ০.১৪২৮৬৩৯ বিটিসি বা প্রায় ৫৫০ ডলার।

ব্লকএক্সপ্লোরারে গেলে bu1s সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য খুঁজে পাবেন। ঠিকানাটি কয়েক লাখ লেনদেন করেছে। কয়েক কোটি বিটিসি এসেছে তার কাছে। সবশেষ তহবিলের পরিমান ছিল ৬০ লাখ বিটিসি। যদি আপনি কোনো ঠিকানার ক্ষেত্রে এরকম বৈশিষ্ট্য দেখেন তাহলে ধরে নিতে পারেন, এটি কোনো কারেন্সি এক্সচেঞ্জের অথবা টাম্বলারের মত কোনো ক্রিপ্টো সার্ভিসের ঠিকানা।

bu1s সম্পর্কে আরো জানতে আমি প্রথমে গুগল সার্চ করি। সেখান থেকে কয়েনটেলিগ্রাফের একটি আর্টিকেল খুঁজে পাই। এটি বাইন্যান্স নামের বেশ পরিচিত একটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ হ্যাক হওয়ার বিতর্কিত ঘটনা নিয়ে লেখা, যা পরে ভুয়া প্রমাণিত হয়। গুজবটি মিথ্যা প্রমাণের জন্য, সেই সময় বাইন্যান্স তাদের বিটকয়েন লেনদেনের একটি পাবলিক ঠিকানা প্রকাশ করে। সেটি শেষ হয় bu1s দিয়ে।

ওয়ালেট এক্সপ্লোরার বা ব্লকচেইন ডট কম ব্যবহার করে বাইন্যান্সের সঙ্গে যুক্ত আরো ঠিকানা বের করা সম্ভব। আপনি যদি ওয়ালেট এক্সপ্লোরারে খোঁজেন সেখান থেকে ৬৪,০০০ ঠিকানা পাবেন। যা প্রাথমিক অবস্থায় খুব একটা কাজের নয়। তাই আরো সহজ করতে আমি bu1s এবং হামাসের বিজ্ঞাপনে দেয়া ঠিকানার মধ্যে হওয়া লেনদেনটিতে ফিরে যাই। তারপর, যেসব লেনদেনে প্রেরকের একাধিক ঠিকানা আছে, সেগুলো চিহ্নিত করি। (ঠিক ধরেছেন, একই লেনদেনে প্রেরক ও প্রাপকের একাধিক ঠিকানা থাকতে পারে। আরো জানতে এই লেখাটি পড়ুন।)

অনেক সময় দেখা যায়, নির্দিষ্ট গন্তব্যে টাকা পাঠানোর সময় কারেন্সি এক্সচেঞ্জের ঠিকানার সাথে আরেকটি ঠিকানা থাকে। দুটো ঠিকানা যে একই এক্সচেঞ্জের, এমনটা না-ও হতে পারে। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হয়।

এমনই একটি লেনদেন হয়েছে পহেলা ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে। ঐ দিন হামাসের ঠিকানায় যে ০.১৩৭৪৭৯৭৪ বিটিসি পাঠানো হয়, তাতে প্রেরক হিসেবে bu1s3eVc দিয়ে শেষ হওয়া দুইটি ঠিকানা ছিল। আমরা নিশ্চিত bu1s বাইন্যান্স নামের একটি এক্সচেঞ্জের। কিন্তু আরেকটি কার?

ব্লকএক্সপ্লোরারে 3eVc সম্পর্কে আরো তথ্য জানার চেষ্টা করলে দেখা যায়, সেখান থেকে মাত্র দুইটি লেনদেন হয়েছে। দেখে মনে হতে পারে, এটি কোনো এক্সচেঞ্জের ঠিকানা নয়। কিন্তু আপনি ওয়ালেট এক্সপ্লোরারে খুঁজলে দেখতে পাবেন এই ঠিকানা এবং bu1s একই ওয়ালেটের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, এটিও বাইন্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাইন্যান্সের সাথে তাৎপর্যপূণ এই যোগাযোগ থেকে কিছু প্রশ্ন আসে। কেন এটা ঘটছে? প্রথমত, এর মানে হল এক বা একাধিক ব্যক্তি এই এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করে আল কাসেমের কাছে টাকা পাঠাচ্ছে। সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে তাদের কাছে টাকা পাঠানো বেআইনী।

আমরা দেখলাম জনপ্রিয় এই প্লাটফরম ব্যবহার করে আল কাসেমের কাছে তার সমর্থকরা টাকা পাঠাচ্ছে। এই তথ্য ব্যবহার করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতরা এক্সচেঞ্জগুলোকে আরো জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে, যাতে ক্রিপ্টোস্পেইস থেকে অশুভ কার্যকলাপে জড়িতদের বিতাড়িত করা যায়। এর মাধ্যমে কোন এক্সচেঞ্জগুলো এই ধরনের কার্যকলাপে জড়িত সেই সম্পর্কে ক্রিপ্টোকারেন্সির বৈধ মালিক এবং জনসাধারণকেও জানিয়ে দেয়া যাবে।

এখন  আপনার পালা। হামাসের বিটকয়েন ঠিকানা Nj3y এবং P6MD থেকে বের করার মত আরো অনেক তথ্য আছে। দেখা যাক আপনারা কতটা খুঁজে পান। উত্তর জানিয়ে দিন এই প্রতিবেদনের নিচে মন্তব্যের ঘরে। অথবা আমাকে টুইট করতে পারেন @bsmith_1853 এই ঠিকানায়।


লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বেলিংক্যাটে। অনুমতি নিয়ে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে। 

ব্রেনা স্মিথ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে’র হিউম্যান রাইটস ইনভেস্টিগেশনস ল্যাবে আন্ডার গ্র্যাজুয়েট গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।  অপপ্রচার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির অবৈধ ব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধান, তার আগ্রহের বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *