সাংবাদিকতায় স্যাটেলাইট ছবি এখন অপরিহার্য, জেনে নিন কীভাবে ব্যবহার করবেন

Print More

English

ঘটনাটি চলতি বছরের জুলাই মাসের। পীড়াদায়ক একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যেখানে দেখা যায় সৈন্যদের একটি দল অস্ত্র ঠেকিয়ে দুই জন নারী ও তাদের দুই ছোট্ট শিশুকে গ্রাম থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। পরে ভিকটিমদের চোখ বেঁধে খুব কাছ থেকে তাদের উপর ২২ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়, এটি ক্যামেরুনের ঘটনা। কিন্তু ক্যামেরুন সরকার প্রাথমিকভাবে ভিডিওটি “ফেক নিউজ” অর্থাৎ ভূয়া খবর বলে উড়িয়ে দেয়।

বিশ্বে এমন অনেক এলাকা আছে, যা দেখতে সেই ভিডিওর ভূখণ্ডটির মত। এমনকি আফ্রিকার যে কোন প্রান্তে একই রকম মানুষও মিলবে অনেক। কিন্তু বিবিসি আফ্রিকা আই, ফুটেজের ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে। অন্য সবকিছুর পাশাপাশি, বহুবছরের স্যাটেলাইট ছবির সাথে সেই ভিডিওর ভূমিচিহ্নগুলো (ল্যান্ডমার্কস) মিলিয়ে, তারা প্রমাণ করে ঘটনাটি কোথায় ও কখন ঘটে এবং এজন্য কারা দায়ী। এমন প্রেক্ষাপটে ক্যামেরুন সরকার তাদের পূর্বের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়। তারা ঘোষণা দেয়, এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন সৈনিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

স্যাটেলাইট ছবি বর্তমানে সাংবাদিকতার একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তথ্য উদ্ঘাটন, সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির প্রভাব, জলবায়ু ইস্যু কিংবা সংঘাতময় অঞ্চলের রিপোর্টিংয়ে পক্ষপাতহীন অন্তঃদৃষ্টি পেতে সহায়তা করায় পেশাদার সাংবাদিকরা এটি ব্যবহার করছেন ব্যাপকভাবে।

সাংবাদিকতার নতুন কক্ষপথ

প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং যুগান্তকারী সব উদ্ভাবন পৃথিবী পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। যা কৃত্রিম উপগ্রহগুলোকে ব্যবসা ও মানুষের কল্যাণের জন্য আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। এটি পৃথিবীকে আমরা যেভাবে অধ্যয়ন করি, তার পদ্ধতিই শুধু পাল্টে দিচ্ছে না, বরং সাংবাদিকতাকেও নিয়ে গেছে নতুন কক্ষপথে। দেখা যাক সেটা কিভাবে হচ্ছে।

পারষ্পরিক সম্পর্ক স্থাপন: আপনার কাছে একটি স্টোরি আছে। কিন্তু আপনি চান আরো নিশ্চিত হতে, বিন্দুগুলোকে সংযুক্ত করতে চান তাদের মধ্যকার পারষ্পরিক সম্পর্ক দিয়ে এবং বিচ্ছিন্ন প্রান্তগুলোকে জোড়া দিয়ে জানতে চান ঘটনা কোথায় ও কখন ঘটেছে। স্যাটেলাইট ছবি যে এই ধরনের বুদ্ধিমত্তা যোগানোর ক্ষমতা রাখে, তা আমরা দেখেছি বিবিসির ক্যামেরুন হত্যাকান্ড উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

“ক্যামেরুনের একজন সোর্স থেকে আভাস পাওয়ার পর,আমরা গুগল আর্থে সেই এলাকার চূড়া রেখার সাথে ছবির অবিকল মিল খুঁজে পাই” বিবিসি নিউজ আফ্রিকা এই তথ্য প্রকাশ করে টুইটারে। “সাধারণ অবস্থান পাওয়ার পরই,আমরা ভিডিওর অন্য খুঁটিনাটি  বিষয়গুলো দেখা শুরু করলাম– পায়ে চলার পথ রেখা, ভবন,গাছপালা- এবং তাদেরকে স্যাটেলাইট ছবিতে পাওয়া দৃশ্যের সাথে হুবুহু মেলালাম।”

এটি সম্ভব হয়, মার্কিন মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সার এর মালিকানাধীন ডিজিটালগ্লোবের সহযোগিতার কারণে। “আমরা ছয় বছরের বিপুল পরিমান ছবি খুঁটিয়ে দেখি, সূত্র অনুসন্ধান করি এবং ভবন,গাছ বা রাস্তার মতো বস্তুগুলোর উপস্থিতির সাথে মিলিয়ে ঘটনার মাস ও বছর চিহ্নিত করতে সক্ষম হই “ –  ব্যাখ্যা করেন ম্যাক্সার নিউজ ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক স্টিভ উড।

 

স্মোকিন’ গান: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এই ছবিটি সরবরাহ করে ডিজিটালগ্লোব, যেখানে দেখা যাচ্ছে দুটি ট্রলার থেকে ক্রীতদাসদের ধরা সী-ফুড একটি বাণিজ্যিক মালবাহি জাহাজে তোলা হচ্ছে।

একইভাবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ২০১৫ সালে ডিজিটালগ্লোবের ক্যামেরার সহায়তায় একটি মানব পাচার চক্র উদঘাটন করে। সেই প্রতিবেদন পুলিৎজার পুরস্কারও জিতেছিল।  কয়েক মাস ধরে ইন্দোনেশিয়া ও পাপুয়া নিউ গিনির সমুদ্র পথে মানব পাচারকারীদের গতিবিধি লক্ষ্য করার পর, গভীর সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট এলাকা, উপগ্রহের মাধ্যমে অনুসরণের জন্য ডিজিটালগ্লোবকে অনুরোধ করে এপি। হালের বিখ্যাত হওয়া স্থিরচিত্র “স্মোকিন’ গান”-এ ধরা পড়ে, দুটি ট্রলার থেকে ক্রীতদাসদের ধরা সী-ফুড কীভাবে একটি বাণিজ্যিক মালবাহি জাহাজে তোলা হচ্ছে। এই প্রতিবেদনের পর দু’হাজারের বেশি ক্রীতদাস মুক্তি পায়;ইন্দোনেশিয়ার সরকার ব্যাপক তদন্ত পরিচালনা করে; মাছ আমদানি সংক্রান্ত মার্কিন আইনও পরিবর্তন হয়। 

ব্রেকিং নিউজ: এটি আপনার হাতে উত্তেজনাকর, এক্সক্লুসিভ একটা ছবি থাকার মতো ব্যাপার। ইরানের গোপন স্থাপনায় পরমানু রকেট তৈরীর স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশের পর, গোটা বিশ্বে সাড়া পড়ে যায়। ছবিটি প্লানেট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তোলা। তাতে শুধু যে মরুভূমিতে  অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি  উঠে এসেছে, তা নয়। বালুর মধ্যে অদ্ভুত কিছু চিহ্নও ধরা পড়েছে, যেগুলো দেখতে অনেকটা রকেট অবতরণ কিংবা উড্ডয়নের মত।

জলবায়ু পরিবর্তন:  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা স্যাটেলাইট ছবির খুব উল্লেখযোগ্য ব্যবহারগুলোর একটি। কোন নির্দিষ্ট এলাকায়, আগের কোনও সময়ের সাথে এখনকার অবস্থার পার্থক্য দেখানোর জন্য এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। 

উপর থেকে তোলা ছবি: ল্যান্ডস্যাট ও সেন্টিনেল উপগ্রহের তোলা ছবি দুটি আমাজন চিরহরিৎ বনের ত্রিশ বছরের পরিবর্তন দেখাচ্ছে।

উদাহরণ স্বরূপ, আমাজন বনের ত্রিশ বছরের পরিবর্তন দেখানোর জন্য ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) ব্যবহার করে কৃত্রিম উপগ্রহ ল্যান্ডস্যাট ও সেন্টিনেলের তথ্য। ছবি দুটিতে লাল রং গাছপালাকে বোঝায়। ডান পাশের ছবিতে বাদামী ছোপ বাড়ছে, যা বিপজ্জনকভাবে বনভূমি উজাড় হওয়ার দৃশ্য তুলে ধরেছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, কারণ ব্রাজিলীয় এই চিরহরিৎ বন বিশ্ব জলবায়ুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এবং অন্যান্য বনের মত চিরহরিৎ বন পুনরায় জন্ম নেয় না।

পরিবর্তন সনাক্তকরণ: বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সম্প্রসারণ ও অবস্থা সনাক্ত করার জন্য প্ল্যানেটের ছবি ব্যবহার করেছে, রয়টার্স।

পুনর্বাসন অগ্রগতি: বাংলাদেশের কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির এবং সম্প্রসারিত এলাকার প্লানেটের তোলা এই ছবিটি ব্যবহার করেছে রয়টার্স।

“শরণার্থী শিবিরের জীবন (লাইফ ইন দ্যা ক্যাম্পস)” শীর্ষক প্রতিবেদনটি তথ্য চিত্রায়নের (ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন) জন্য ডেটা জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ জিতে নেয়। প্রতিবেদনে দেখানো হয়,মাত্র কয়েক মাসে কত দ্রুত গতিতে ক্যাম্পের সংখ্যা বেড়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে হাজার হাজার লোক গাদাগাদি করে অবস্থান করছে এবং সেখানে মৌলিক স্বাস্থ্য সুবিধা এমনকি খাদ্য ও পানির অভাব রয়েছে।

একইভাবে তুরস্ক কিংবা দক্ষিণ সুদানের সংঘাতপ্রবণ এলাকা সনাক্ত করা এবং শরণার্থী শিবিরে দুর্দশার চিত্র নিয়ে প্রতিবেদন তৈরীতে উপগ্রহ ছবি ব্যবহৃত হয়েছে।

যুদ্ধাঞ্চল রিপোর্টিং: বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের প্রতিবেদন তৈরীতে উপগ্রহ ছবি কার্যকর টুলসে পরিণত হয়েছে – তা হোক অনিচ্ছাকৃত ক্ষতিসাধন কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করা। সিরিয়া ও ইরাকে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘর্ষে আইএসের শক্ত ঘাঁটি, আলেপ্পোর ধ্বংসযজ্ঞ এবং ধ্বংস হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সনাক্ত করা হয় স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে।

ধ্বংসযজ্ঞ: আইএসআইএস-এর কাছে থেকে রামাদি মুক্ত করার আগে ও পরের ছবির মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, আইএস-এর কাছ থেকে রামাদি মুক্ত করার আগে ও পরের এই ছবি থেকে ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপক প্রমান পাওয়া যায়। জাতিসংঘের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, জুলাই ২০১৪ থেকে জানুয়ারী ২০১৬ সালের মধ্যে সেখানকার প্রায় দু’হাজার ভবন, রাস্তা বা সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে।

জঙ্গি বা কর্তৃত্ববাদী অঞ্চল ট্র্যাকিং: আইএস, বোকো হারাম বা তালিবানের মত জঙ্গি অধ্যূষিত এলাকায় বেসামরিক কর্তৃপক্ষ কিংবা গণমাধ্যম সবসময় প্রবেশ করতে পারে না। এমন ক্ষেত্রে উপগ্রহ ছবি তাদের নৃসংশতা বা ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

একইভাবে, বিশ্বের বড় অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরে যা ঘটছে, তা জানার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্যাটেলাইট। ইলেট্রো অপটিক্যাল (ইও) ছবির মাধ্যমে কয়েক বছর ধরে ট্র্যাক করা হচ্ছে, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কার্যক্রম; এমনকি সাধারণ জীবনযাপন, বিদ্যুত সরবরাহ, বনায়ন এবং গৃহায়নের মত বিষয়ও।

দুর্গম এলাকায় প্রবেশ: দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল, যেখানে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, সেখানেও ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে স্যাটেলাইট ছবি।  পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়েও সতর্ক করতে পারে সবাইকে।

বিস্ফোরণ দৃশ্য: ২০১১ সালের ১১ই মার্চ ফুকুশিমা পারমাণবিক প্লান্টের প্রথম বিস্ফোরণের তিন মিনিট পর এই ছবিটি তুলেছিলো ডিজিটালগ্লোব।

এর বড় উদাহরণ, জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক প্লান্টে বিস্ফোরণের ঘটনা। ২০১১ সালের ১১ই মার্চ, প্লান্টের প্রথম চুল্লীটি বিস্ফোরণের মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে ছবিটি তোলে ডিজিটালগ্লোব; যা  ফুকুশিমার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বকে জানানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, তখন সেখানে কেউ প্রবেশ করতে পারছিল না।

সুনামির পর: ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও সুনামির পর ইন্দোনেশিয়ার উপকূল বরাবর জনবসতিগুলো কীভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় তা দেখা যাচ্ছে উপগ্রহ ছবিতে।

আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প বা বন্যার মতো ভয়াবহ সব ঘটনায় ধ্বংস ও ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য প্রকাশ করতে পারে উপগ্রহ চিত্র। উদাহরণ স্বরূপ, দুর্যোগের আগে ও পরের দুটি ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিধ্বংসী সুনামির পর ইন্দোনেশিয়ার উপকূল বরাবর আবাসিক এলাকাগুলো কীভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ: নাসা, এসা এবং ইসরোর মত জাতীয় মহাকাশ সংস্থা, বিরূপ আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট দেয়। গণমাধ্যমগুলো এসব সতর্কবার্তা প্রচারের মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দিতে পারে। তখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে।

ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট: কোনও বড় ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট হিসেবে ব্যবহার হতে পারে স্যাটেলাইট ছবি। নিচের ছবিটি এর বড় উদাহরণ। ৯/১১-এর ঘটনায়  আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের এই ছবি ধারণ করেন নাসার মহাকাশচারী ফ্রাঙ্ক কুলবার্টসন – যেখানে ঘটনাস্থল থেকে একটি ধোঁয়ার কুন্ডলি উড়তে দেখা যায়।

গ্রাউন্ড জিরো: আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে নাসার মহাকাশচারী ফ্রাঙ্ক কুলবার্টসনের ধারন করা ৯/১১-এর একটি ছবি।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অভিষেক অনুষ্ঠান বা ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক পরবর্তী নারী পদযাত্রায় কত মানুষ অংশ নেন, এমনকি অলিম্পিক কিংবা ফিফা বিশ্বকাপের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া ইভেন্টে স্টেডিয়ামে কত দর্শক এসেছে, এমন তথ্য পেতেও স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করা হয়।

হাতের কাছেই সেবা

স্যাটেলাইট স্থাপন ও পরিচালনায় বিপুল খরচের পরও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে তথ্য দেয়। ইউএসজিএস ওয়েবসাইটে অবাধে পাওয়া যায় নাসার ল্যান্ডস্যাটের ছবি। ইএসএ’র কোপার্নিকাস ডেটাসেটের ছবি পাওয়া যায় সেন্টিনেল হাব-এর মাধ্যমে। ভারতীয় স্পেস এজেন্সির ভুবন পোর্টালও ফ্রি ছবির একটি বড় উৎস, অবশ্য সেখানে কিছু পুরনো ছবিও থাকতে পারে। গুগল আর্থ ফ্রি ছবির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে মনে রাখতে হবে এখানে সব সময় ভালো রেজ্যুলুশনের ছবি পাওয়া যায় না এবং ছবি জোড়া দেয়ার সমস্যার কারনে ক্রটি থাকতে পারে। ডিজিটালগ্লোব এবং এয়ারবাসের মতো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট সরবরাহকারীরা বেশিরভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিনামূল্যে কিছু মৌলিক তথ্য যোগান দেয়। প্ল্যানেটের একটি সংবাদ বিভাগ রয়েছে, যেখানে ছবির পাশাপাশি এসংক্রান্ত টুলসও পাওয়া যায়।

মান সম্পন্ন তথ্যের পাশাপাশি সেখান থেকে সাংবাদিকরা কিছু বিশেষ সার্ভিসও পেয়ে থাকেন।

ম্যাক্সার নিউজ ব্যুরো: এটি পরিচালিত হয়  কিছু গণমাধ্যমের সাথে ম্যাক্সার গ্রুপের অংশীদারিত্বে। তারা ‘পুশ এন্ড পুল’- এই দুই উপায়ে সেবা প্রদান করে। ‘পুশ’ হচ্ছে, যখন ম্যাক্সার, তাদের সাথে নিবন্ধিত মিডিয়ায় প্রকাশের জন্য কোনো নির্বাচিত ঘটনার ছবি পাঠায়। “আর ’পুল’ হচ্ছে একধরনের বিশেষ সেবা, যেখানে ম্যাক্সার কোনও গণমাধ্যমের চাহিদা অনুযায়ী এক্সক্লুসিভ ডেটাসেট যোগান দেয়। স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে কোনও ঘটনা উন্মোচনের জন্য তারা নিজস্ব অ্যানালিস্ট দেয় গণমাধ্যমকে। সেই অ্যানালিস্ট সাংবাদিকদের সাথেই কাজ করেন।” বলেন ম্যাক্সারের জনসংযোগ পরিচালক টার্নার ব্রিনটন।

স্যাটেলাইট টাস্কিং: ম্যাক্সারের এই সার্ভিস মূলত এমন পরিস্থিতির জন্য, যখন একটি গণমাধ্যমের কোনও নির্দিষ্ট সময়ে, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নজরদারি প্রয়োজন হয়। এজন্য আগ্রহীদের যোগাযোগ করতে হবে ম্যাক্সার নিউজ ব্যুরোর সাথে। অবশ্য এই সেবা পেতে টাকা দেয়া লাগে।

বিশ্লেষণী টুলস্: ছবি বিশ্লেষণ করে সেখান থেকে স্টোরি বের করার জন্য অনলাইনে বেশকিছু সহজ অ্যানালিটিকস টুল রয়েছে। যেমন, প্ল্যানেট কম্পেয়ার। দুটি ছবিকে বাছাই করে, তাদেরকে পাশাপাশি স্লাইডে রেখে, তুলনামূলক বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয় টুলটি। একইভাবে, প্ল্যানেট টাইমল্যাপ্স, একই বিষয়বস্তুর  একাধিক ছবি বাছাই করে, তাকে জোড়া দিয়ে, পরিবর্তনের একটি অ্যানিমেটেড স্টোরি তৈরি করতে পারে আপনার জন্যে। প্ল্যানেটের সিইও উইল মার্শাল বলেন, “তাদের কাছে পৃথিবীর প্রতিটি ভূখন্ডের নির্দিষ্ট অবস্থানের প্রায় পাঁচ’শটি করে ছবি রয়েছে – যা পরিবর্তন বোঝার জন্য একটি বিশাল ডেটাসেট।” “আমরা এই টুলস তৈরি করেছি যাতে সাংবাদিকরা বিশ্বে যা ঘটছে তা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং তারা সেইসব ঘটনা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য পান।”

টমমনোড, জিওহাইভ, ওপেন স্ট্রিট ম্যাপ (OpenStreetMap), এসরি’র লিভিং এ্যাটলাস অফ দ্যা প্ল্যানেটের মতো টুলস্ থেকেও যে কেউ সাহায্য পেতে পারেন। টমনোড একটি স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ, যা ডিজিটালগ্লোব থেকে স্যাটেলাইট ছবি এবং ক্রাউডসোর্সিং বা গণউৎস থেকে ডেটা সংগ্রহ করে। এটি বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। ২০১৪ সালের মার্চে, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের নিখোঁজ হওয়া বিমান খুঁজে বের করতে স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো তারা। এরপর উচ্চ ট্র্যাফিকের কারণে সাইটটি দুই দিনের জন্য ডাউন ছিল (প্রতি মিনিটে  ভিজিট ১০০,০০০)।

ওপেন স্ট্রিট ম্যাপ, একটি বিশাল উন্মুক্ত ডেটাসেট। এর নিবন্ধিত ব্যবহারকারীই রয়েছে ৪০ লাখ। হিউম্যানিটেরিয়ান ওপেনস্ট্রিটম্যাপ টিম নজর দেয়, মূলত বিশ্বব্যাপী সঙ্কট মানচিত্রায়নে। তারা বিভিন্ন সংস্থার দেয়া উপগ্রহ ছবি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এনভায়রনমেন্টাল সিস্টেমস রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এসরি, তাদের সহযোগী যত প্রতিষ্ঠান এবং আর্কজিআইএস (ArcGIS) এর হাজারো ব্যবহারকারীর তৈরি, অসংখ্য মানচিত্র ও লেয়ার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয় লিভিং এ্যাটলাস অব দ্যা ওয়ার্ল্ড। এর কিছু উন্মুক্ত এবং কিছু শুধু আর্কজিআইএস লাইসেন্সধারীদের জন্য সংরক্ষিত।

ভিজ্যুয়ালাইজেশনের উপকরণ: ছবিনির্ভর প্রতিবেদনকে আকর্ষণীয় করার জন্য অনেক সহজলভ্য টুলস রয়েছে। যেমন, এসরি স্টোরি ম্যাপস, টাইমলাইন জেএস, ওডিসি জেএস, থিংলিঙ্ক, ম্যাটারম্যাপ, উইজেটিক। এদের বেশিরভাগই ফ্রি এবং ওপেন সোর্স। প্রতিবেদনের উপস্থাপনাকে আকর্ষণীয় করতে এগুলো কাজে আসতে পারে।

থ্রিডি এন্ড অগমেন্টেড রিয়েলিটি: আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ’ইফেক্ট’ ব্যবহারের  অসংখ্য ওপেন সোর্স টুল রয়েছে। ধরুন একটি শহরে হারিকেন আঘাত হানছে; তার সম্ভাব্য গতিপথ দেখাতে বা এমন ক্ষেত্রে এই টুল কাজে আসে। এগুলো ফ্রি এবং সহজে ব্যবহার করা যায়।

নতুনদের জন্য নির্দেশিকা

যদিও স্যাটেলাইট ‘বার্ডস আই ভিউ’, অকাট্য তথ্যের সহজপ্রাপ্যতা এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে সাংবাদিকতার জন্য সম্ভাবনার নতুন নতুন দূয়ার খুলে দিচ্ছে, তবুও কিছু নির্দেশিকা অবশ্যই মনে রাখতে হবে

শুধু ব্যবহারের খাতিরে ব্যবহার নয়: উপগ্রহ ছবি যদি প্রতিবেদনে কোন অর্থ যোগ না করে, তাহলে তা ব্যবহার করা উচিৎ নয়। শুধুমাত্র দেখতে সুন্দর বলেই তা কাজে লাগাতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। সাজসজ্জার জন্যে সাদামাটা ছবিই ভাল। ধরুন, কোথাও বড় কিছু ঘটেছে, আপনার কাছে তার স্যাটেলাইট ছবিও আছে। কিন্তু তা প্রতিবেদনে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনও কিছু যোগ করছে না। এমন অবস্থায় ঘটনাস্থলের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরতে, স্যাটেলাইট ছবির বদলে মানচিত্র ব্যবহার করাই ভালো।

টেকনিক্যাল ডেটার গভীরে যাবেন না: নাসা কিংবা ইএসএ’র মত মহাকাশ সংস্থাগুলোর এমন উপগ্রহ রয়েছে, যা বরফ, বাতাস, সমুদ্র ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি পরিমাপের জন্য রাডার বা অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। এসব বিশেষায়িত ডেটাসেট বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ। এধরনের ছবি বা তথ্য তখনই ব্যবহার করবেন, যখন সেই ডেটার অর্থ বোঝার মত কোনও বিশ্লেষক আপনার গণমাধ্যমে থাকে। সবচেয়ে ভাল বিকল্প হচ্ছে ওই সব বিষয়ে নাসা বা ইএসএ’র তৈরী করা প্রতিবেদন দেখা, অথবা একজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলা।

স্যাটেলাইট আছে, আপনি ভাগ্যবান, কিন্তু হতাশ হবার জন্যেও তৈরি থাকুন। কখনও কখনও দুর্বল রেজ্যুলেশন বা মেঘাচ্ছন্নতা, এমন সব কারনে – অনেক এলাকার ছবিতে কিছুই পাওয়া যায় না। যদি সামর্থ্য থাকে, আপনার চাহিদামত এলাকায় স্যাটেলাইট নিয়োজিত করতে বলতে পারেন  ডিজিটালগ্লোবকে।

স্যাটেলাইট এক এলাকা একইদিনে অনেকবার পর্যবেক্ষণ করতে পারে না: স্যাটেলাইট আবর্তনের সময় এখন অনেক কমেছে। তারপরও, প্লানেট হচ্ছে সর্বোত্তম উদাহরণ, যেটি পুরো পৃথিবী দিনে মাত্র একবার পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

রাতের ছবি অস্পষ্ট, মেঘ এবং ধোঁয়াও কৃত্রিম উপগ্রহের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। আবার এমন রাডার উপগ্রহ রয়েছে, যা রাতে এমনকি মেঘের ভেতর দিয়েও দেখতে বা ছবি তুলতে সক্ষম। কিন্তু এক্ষেত্রেও যতক্ষন না কেউ বিশ্লেষণ করছেন, ততক্ষণ সেগুলো ব্যবহার করবেন না। কারণ কোনও সাধারন ব্যক্তি এর পাঠোদ্ধার করতে পারেন না।

রেজ্যুলুশন গুরুত্বপূর্ণ: আগে জানুন আপনি কি চান। যদি কোনো  বন্যা দুর্গত শহর কিংবা ভূমিকম্প বিধ্বস্ত ভূখণ্ডের দিকে দৃষ্টি দিতে চান, সেক্ষেত্রে ফ্রি তথ্যের চমৎকার উৎস হতে পারে ল্যান্ডস্যাট এবং সেন্টিনেলের মত সরকারি উপগ্রহগুলো। কিন্তু “কোনও কনস্ট্রাকশন সাইটে কে, কী করছে, মানুষের এমন কার্যক্রম যদি বুঝতে চান, তাহলে হাই-রেজ্যুলুশন ছবি লাগবে।” বলেছেন ব্রিনটন।

শুনতে বোকার মত মনে হতে পারে- কিন্তু নতুনদের জানা উচিত – একটি ছবি বেছে নেওয়ার পর, তাকে ফটোশপে আরো স্পষ্ট করার কোনও উপায় নেই।

এমনকি হাই-রেজ্যুলেশনেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে: ডিজিটালগ্লোব আপনাকে খুব বেশি হলে ওয়ার্ল্ড ভিউ ৩ এবং ৪-এ তোলা ৩০ সেমি রেজ্যুলুশন ছবি দিতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, স্যাটেলাইট ছবি মানুষর চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু তার পরিচয় জানাতে পারে না; এগুলো রাস্তায় যানবাহন চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু গাড়ীর মডেল সনাক্ত করতে পারে না।

এটি কোনও জটিল বিদ্যা নয়

অনেক সাংবাদিক এখনও মনে করেন, ছবি হলো নিছক ভিজ্যুয়ালাইজেশন – যা একটি প্রতিবেদন উপস্থাপনের শেষ ধাপ – কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ছবিই হতে পারে আপনার প্রাথমিক তথ্য।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে রিপোর্টিংয়ে স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহারের বেশ কিছু উপায় রয়েছে, বিশেষ করে যখন  সাংবাদিকতার অন্য পদ্ধতি এবং উৎসের সাথে এর সমন্বয় করা হয়। দুর্যোগ বা অবস্থার পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রতিবেদন করা সহজ। কিন্তু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে এবং সব অনুসন্ধান ফলপ্রসূও হয় না। সুতরাং ধৈর্য্য ধরুন। ব্রিনটন এই বলে শেষ করেছেন,”আমরা সাহায্য করতে সক্ষম হব কিনা জানতে, রিপোর্টিংয়ের শুরুর দিকেই যোগাযোগ করুন।”


নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশ করে জিওস্পেশিয়াল ওয়ার্ল্ড এবং অনুমতিক্রমে তা এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হলো। আরো ফলো করুন জিআইজেএন-এর রিসোর্সেস ফর ফাইন্ডিং অ্যান্ড ইউজিং স্যাটেলাইট ইমেজেস

অনুসুয়া দত্ত জিওস্পেশিয়াল মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনসএর নির্বাহী সম্পাদক। তিনি একজন অপেশাদার লেখক, পেশায় সম্পাদক, ব্যক্তিতাড়নায় একজন প্রযুক্তি ভাষ্যকার। তিনি খবর ও সংখ্যা সম্পর্কে আগ্রহী, কিন্তু তাকে সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত করে ভূ-রাজনীতি। দত্ত #IJAsia18-এ ”দ্যা নিউ এজ অব স্যাটেলাইট ইমেজারি” বিষয়ক একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *